![]() |
| ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে |
হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে অস্থির নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ
লেখক: কৃষ্ণ এন. দাস ও সাম জাহান
১৮ নভেম্বর ২০২৫
সারসংক্ষেপ
রায় ঘোষণার পরই ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ
হাসিনাকে ভারতে থেকে ফেরত আনার চাপে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকলে গণবিক্ষোভের হুমকি দিয়েছেন হাসিনার ছেলে
রাজনৈতিক অস্থিরতায় পোশাক রপ্তানি ও অর্থনীতি ঝুঁকিতে
ঢাকা, ১৯ নভেম্বর (রয়টার্স) — নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায়ের পরও গত বছরের ছাত্রনেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলন ও সহিংস দমন-পীড়নে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশের ক্ষত এখনও নিরাময় হয়নি।
প্রতিবাদে নিহতদের পরিবার অবিলম্বে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবি করছে। সরকার চাপ দিচ্ছে ভারতের ওপর, যেখানে হাসিনা গত বছর পালিয়ে গিয়েছিলেন।
রায়ের পর আদালতে উল্লাস ঝড়লেও নিহতদের স্বজনরা হাসিনার ফাঁসি দ্রুত কার্যকরের দাবি তোলে। কিন্তু তাকে ফেরত আনার প্রচেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন— ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা না ওঠে, তবে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হবে। এতে ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশটি অস্থির হয়ে উঠতে পারে, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে পোশাক রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে, এবং ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় থমকে যায়।
“সত্যিকারের বিচার তখনই হবে যখন তার গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো হবে,” বলেন আব্দুর রব, যার ছেলে আন্দোলনে নিহত হয়েছিল। ব্যানারে তিনি দেখাচ্ছিলেন ফাঁসির দড়ি ও লেখা— “খুনি হাসিনা”।
“তখনই আমরা জাতির ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় মুছে ফেলতে পারব।”
২০ বছরের শাসন— যার মধ্যে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন— শেষে হাসিনা রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, “গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটহীন একটি অনির্বাচিত সরকার পরিচালিত সাজানো ট্রাইব্যুনালের রায়।”
---
ভারতের সাথে সম্পর্কে উত্তেজনা
আসন্ন নির্বাচন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরবে— দুই দলের এই পালাবদল দেশের ইতিহাসে বহু পুরোনো।
এদিকে ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধিত্বে ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনাকে দেশে ফেরানোর চ্যালেঞ্জের মুখে।
রায়ের পর ভারতকে সরকার জানায়—
“হাসিনাকে ফেরত না পাঠানো অত্যন্ত অমিত্রতাপূর্ণ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবমাননা।”
ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলে—
“উভয় দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী এটি ভারতের বাধ্যবাধকতা।”
তবে এর আগের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।
নয়াদিল্লি জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সব পক্ষের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে।
ভারত সরকারের এক সূত্র জানায়, প্রত্যর্পণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া— ট্রাইব্যুনালের নথি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হতে হয় যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, সুষ্ঠু প্রতিনিধিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য ছিল কি না। নথি ছাড়া ভারত এগোতে পারে না। তাছাড়া মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হলে চুক্তির ছাড় দেওয়ার বিধানও আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জ্যোতি রহমান বলেন,
“তাদের দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে না, কিন্তু চিরতরে শত্রুতায়ও থাকতে পারে না। হাসিনা যতদিন ভারতে আছেন, বাংলাদেশের পক্ষে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। ভারতও সেটি বুঝে।”
---
সহিংসতার আশঙ্কা
রায়ের আগেই ঢাকায় সহিংসতা বাড়ে— রবিবার কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ হয় এবং ১২ নভেম্বর একদিনেই ৩২টি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। বেশ কিছু বাসেও আগুন দেওয়া হয়। এসব নাশকতার অভিযোগে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
হাসিনার ছেলে ও উপদেষ্টা ওয়াজেদ বলেন, যদি আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা না ওঠে তাহলে তারা জাতীয় নির্বাচন বাধা দেবে।
তিনি বলেন,
“বড় বিক্ষোভ হবে... মুখোমুখি সংঘর্ষ হবে।”
তিনি জানান, তার মা দেশের সব নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, এবং তিনিও নিয়মিত যোগাযোগে আছেন।
“আমাদের শত-শত নেতাকর্মী আছে, কোটি সমর্থক আছে। তারা ক্ষুব্ধ।”
অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সহিংসতায় জড়িত থাকার কারণে আওয়ামী লীগ এখনও “আইনগতভাবে নিষিদ্ধ”, এবং “সহিংসতার উসকানি” দিলে দলের অবস্থান আরও কঠিন হবে।
সরকারের ভাষায়,
“আমাদের মূল লক্ষ্য জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা, এবং নির্বাচনের আগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সংযম, আনুপাতিক ব্যবস্থা ও সংলাপকে অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
২৪ বছর বয়সী আমান উল্লাহ, যিনি আন্দোলনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, বলেন—
“আমি আর দেখতে পাই না। কিন্তু যেদিন শুনব তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, সেদিনই আমার জন্য ঈদের চেয়েও বড় আনন্দ হবে।”
--- (রয়টার্স)





















